কাজীর গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই

ইমাম, আলেম ও ওয়ায়েজগণের প্রতি সাধারণ মানুষের যে শ্রদ্ধা -ভক্তি এতদিন ছিলো, তা একান্তই আল্লা'র ওয়াস্তিয়া। অর্থাৎ শুধু আল্লাহর জন্যই তাদেরকে মানুষ ভালোবেসেছে। দিয়েছে আপন পিতা-মাতার থেকেও অধিক সম্মান। কিন্তু দুঃখ জনক হলেও সত্য, হালের কয়েকটি ঘটনায় আলেম সমাজের প্রতি সেই ভক্তি ও ভালোবাসা কমতে শুরু করেছে 'ফোর জি'র স্পিডে। বিষয়টা নিশ্চয়ই আলেম সমাজও টের পাচ্ছেন এবং বিভিন্ন মজমায় নতুন করে 'আলেম-ওলামার প্রতি মুহাব্বাতের ফযিলত' বর্ণনা শুরু করেছেন।

বহুকাল থেকে এই অঞ্চলের সাধারণ মুসলিমরা ব্যক্তি জীবনে পূর্ণাঙ্গ ইসলামের অনুসারী না হলেও মসজিদ, মাদরাসা, মাজার, খানকা, পীর-মাসায়েখ, আলেম-ওলামাগণের প্রতি ছিলেন সন্দেহাতীত উদার এবং অন্ধ সমর্থনকারী। কোথাও মসজিদ-মাদরাসার সাথে কারো বিরোধ হয়েছে? নিশ্চয়ই অপরপক্ষ দোষী। কিংবা কোন আলেমের বিরুদ্ধে কেউ কুৎসা রটিয়েছে? ওই বেটা নির্ঘাত একটা পাজী। অমুক শ্রদ্ধেয় আলেম করতেই পারেন না এমন কাজ ! এই ছিলো এবং এখনো হয়তো কিঞ্চিৎ আছে সাধারণ মুসলমানদের মনে ধর্মীয় স্থান ও আলেমদের প্রতি নিরঙ্কুশ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। 

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা, যুগ যুগ ধরে আলেম সমাজও সেই মোতাবেকই কাজ করে গেছেন। অর্থাৎ সম্মান ও মর্যাদার উপযুক্ত ভূমিকাটিই তাঁরা রেখে গিয়েছেন। এমনকি দেশ ও দশের বিভিন্ন সংকট কালে সময়ের সর্বোচ্চ সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন এই আলেম সমাজই। জেল,জুলুম, হুলিয়া মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়েছেন অত্যাচারিতের পাশে। কে না জানে , এই ভারত উপমহাদেশ থেকে ইংরেজ খেদাও আন্দোলনের সর্বপ্রথম ডাক দিয়েছিলেন আমাদের আলেম সমাজ। সেই এক সময় ছিলো আলেমগণের শ্রদ্ধা, সম্মান, প্রভাব ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতার, আর এখন..........................?

কিন্তু কেন?

বলতে দ্বিধা নেই , বর্তমানে আলেম সমাজের সেই ভূমিকাও নেই, ত্যাগের নজরানাও নেই পূর্বের মতো। আজ ও হয়তোবা থেমে নেই আলেমদের লাশের মিছিল। জুলুম, নির্যাতন ও কারাবরণের তালিকাও দীর্ঘ। কিন্তু এসবের পিছনে শুধু তো 'লিল্লাহিয়্যাত' নেই, আগে যেমন ছিলো। আছে শুধু রাজনৈতিক উচ্চাভিলাস, অর্থের লিপ্সা এবং ক্ষমতার মসনদে বসার নমরুদী আকাংখা। 
অন্তত হিফাজতের সাম্প্রতিক আন্তঃকোন্দল, বিভাজিত দুই শিবিরের একটির সঙ্গে সরকারের এবং অন্যটির সঙ্গে বিরোধী দলের আঁতাত তাই প্রমাণ করে। এমনকি ক্ষমতার দ্বন্ধে সর্বজন শ্রদ্ধেয় একজন বর্ষীয়ান অলেমের মহাপ্রয়াণ স্বাভাবিক মৃতু, না-কি অন্য আলেম দ্বারা হত্যা, এই ইস্যু যখন আদালত পর্যন্ত গড়ায় তখন আলেম সমাজের ব্যাপারে কি ভাবতে পারে সাধারণ মানুষ , তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। অভক্তি-অশ্রদ্ধার কথা নাই বা বললাম।

ঘটনা এখানে থেমে গেলেও যেতে পারতো। কিন্তু না, সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের কফিনে আপাতত শেষ পেরেকটি যে ঠোকা বাকী ছিলো! তাও হয়ে গেলো রয়েল রিসোর্ট কান্ডের মধ্য দিয়ে। দেশ বিখ্যাত জনৈক আলেম দুই দুটি নারী কেলেংকারীতে জড়িয়ে গেলেন। এমন তো হওয়ার কথা ছিলোনা! তাহলে মানুষ আর কাদেরকে বিশ্বাস করবে? তবেকি 'তাঁহারা ওয়াজ-মাহফিলে যেই নসিহত পেশ করিয়া থাকেন , পরনারীর দিকে তাকানো হারাম, তাহা শুধুই সর্বসাধারণের জন্য? উহাদিগের জন্য নহে?' 
এই জন্যই কিছু দুষ্ট লোক যে বলে, এখন ওয়াজ-মাহফিল একটা ব্যবসা, এই কথার পাল্টা জবাব দেওয়ার কোন সুযোগ থাকেনা।

ঘটনার এখানেই শেষ নয়। এই ক'দিন আগে যুগান্তরের খবরে প্রকাশ, 'চাকরি হারিয়ে ইমামের আত্মহত্যা'। ওই ইমাম সাহেব কি জানতেন না আত্মহত্যা মহাপাপ? পনেরো বছরের ইমামতিতে তিনি নিশ্চয়ই বহুবার আল্লাহর উপর তাওাক্কুলের বয়ান করেছেন মসজিদে! তাহলে কি তার নিজেরই 'তাওাক্কুল' ছিলোনা আল্লাহর উপর? হায়াত-রিজিক-বিচারের একমাত্র মালিক আল্লাহ, এই বিশ্বাস সাধারণ মুসলমানেরা কম-বেশি লালন করলেও কতিপয় আলেমের সাম্প্রতিক কৃতকর্ম দেখে মনে হচ্ছে উক্ত বিশ্বাসের ছিটেফোঁটাও নেই তাদের মাঝে। যদি যাররা পরিমাণও বিশ্বাস অবশিষ্ট থাকতো, তাহলে আলেমদের পারস্পরিক খ্যাতি ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, নারী কেলেংকারী, আত্মহত্যা সহ অন্যায়ভাবে মসজিদ-মাদরাসা দখলের ঘটনা আমাদের শুনতে হতোনা। 

সার্বিক অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে, বর্তমানে অনেক আলেম মসজিদে, মাহফিলে যতই ওয়াজ নসিহত করুন, বাস্তব জীবনে তা নিজেরা আমল করেন না। বুঝতে পারছিনা, তাদেরকে আলেম বলবো, না-কি নামধারী আলেম বলবো? তাদের ওয়াজ ও আমল যেন 'কাজীর গরু'র মত। অর্থাৎ কাজীর গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই।

-মাহতাব ফারাহী

 

 

 

 

​​